Thursday, February 29, 2024

ড্রাগনফ্লাই : এ যেন ডাইনোসর যুগের এক জীবন্ত জীবাশ্ম

- Advertisement -

ড্রাগনফ্লাই -দের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ সেই ডাইনোসর যুগের ‘গ্রিফেনফ্লাই’ ছিল খুবই হিংস্র। বাতাসে কার রাজত্ব চলবে তাই নিয়েই সর্বক্ষণ চলত তাদের ঝামেলা। তিনশো কোটি বছর পর শরীর ও বৈশিষ্ট্যের একাধিক পরিবর্তন ঘটলেও হিংস্র স্বভাব কিন্তু তাদের আজও বজায় রয়েছে। তাই পৃথিবীতে যতরকম যুদ্ধবাজ পতঙ্গ রয়েছে, ড্রাগনফ্লাই তাদের সেরা। পুরুষদের হিংস্রতা স্ত্রীদের তুলনায় কিছুটা বেশি। দুই পুরুষ একে অপরকে একদমই পছন্দ করতে পারে না।


ড্রাগনফ্লাই : এ যেন ডাইনোসর যুগের এক জীবন্ত জীবাশ্ম
Image by Marco Federmann from Pixabay

সজয় পাল : সাধারণভাবে যাকে জলফড়িং বলা হয়, অন্য অর্থে তাকেই গয়াল পোকা বলে। আর তাকেই ইংরেজিতে বলে ড্রাগনফ্লাই। ড্রাগনফ্লাই -এর জন্ম বৃত্তান্ত লুকিয়ে রয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি বছর আগের পৃথিবীতে, ডাইনোসর যুগে। বিশালাকার প্রাণীগুলো যখন পৃথিবীর মাটি দাপিয়ে বেড়াত, তখন অন্য পতঙ্গদের সঙ্গে আকাশের দখল নিতে ব্যস্ত থাকত ‘গ্রিফেনফ্লাই’। ফসিলস্ থেকে জানা যায়, গ্রিফেনফ্লাই-এর ডানার আকার ছিল প্রায় আড়াই ফুট। খুবই হিংস্র স্বভাবের এই প্রাণীরা ছিল মূলত মাংসাশী। এই ‘গ্রিফেনফ্লাই’-ই পরবর্তী ৩০০ কোটি বছর ধরে বারংবার শারীরিক অভিব্যক্তি ঘটিয়ে আজকের ড্রাগনফ্লাই বা গয়াল পোকা বা জলফড়িং হয়ে বেঁচে রয়েছে। বর্তমানে এদের ডানার আকার মাত্র দুই থেকে পাঁচ ইঞ্চি মাত্র।

ড্রাগনফ্লাই সাধারণত শীতল জলাশয়ের কাছাকাছি থাকতে বেশি পছন্দ করে। স্ত্রী ড্রাগনফ্লাই জলের উপরি অংশে বা ছোটো ছোটো জলজ উদ্ভিদের উপর একবারে কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার ডিম পাড়ে। অধিকাংশ ডিমই নানান কারণে নষ্ট হয়ে যায়। বাকি ডিমগুলি কিছুদিন পর ফুটে লার্ভা-ই পরিণত হয়। তারপর ধীরে ধীরে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে পা, ডানা, মাথা গজিয়ে পূর্ণাঙ্গ ড্রাগনফ্লাই -এর রূপ পাই।

ড্রাগনফ্লাই -এর দৃষ্টি শক্তি অত্যন্ত প্রখর। মাথার প্রায় ৭০% অংশ নিয়ে এদের চোখের অবস্থান। পুঞ্জাক্ষি বিশিষ্ট চোখ দুটিতে প্রায় ৩০,০০০ লেন্স থাকে। ৩৬০ ডিগ্রি কোণ থেকেও এরা দিব্যি দেখতে পাই। তাই এরা সহজেই শিকারিদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে পারে। আবার মানুষের মতো এরা সব রঙ দেখতেও পাই। তাই শিকার ধরাও খুব সহজ হয়ে যায় এদের কাছে।

এদের ডানা খুব শক্ত, স্বচ্ছ আর খসখসে। তাই এরা যেমন প্রচণ্ড গতিতে উড়তে পারে, জল বা বাতাসেও এদের ডানার কোনও ক্ষতি হয় না। ওড়ার সময় এরা অত্যন্ত দ্রুত উপর-নিচে, পাশাপাশি বা আগে-পিছে নিজেদের ঘোরাতে পারে। এমনকি খুব দ্রুত ওড়ার সময়েও এই কাজগুলি এরা সহজেই করে ফেলতে পারে। আবার কখনও কখনও এরা খোলা বাতাসে উড়ন্ত অবস্থায় স্থিরভাবে দাঁড়িয়েও থাকতে পারে। এমনকি খুব দ্রুত ‘U-টার্ন’-ও এদের কাছে প্রায় জলভাত। ওড়ার সময় এদের গতি হয় প্রায় ৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা।

ড্রাগনফ্লাই -দের পূর্বপুরুষ অর্থাৎ সেই ডাইনোসর যুগের ‘গ্রিফেনফ্লাই’ ছিল খুবই হিংস্র। বাতাসে কার রাজত্ব চলবে তাই নিয়েই সর্বক্ষণ চলত তাদের ঝামেলা। তিনশো কোটি বছর পর শরীর ও বৈশিষ্ট্যের একাধিক পরিবর্তন ঘটলেও হিংস্র স্বভাব কিন্তু তাদের আজও বজায় রয়েছে। তাই পৃথিবীতে যতরকম যুদ্ধবাজ পতঙ্গ রয়েছে, ড্রাগনফ্লাই তাদের সেরা। পুরুষদের হিংস্রতা স্ত্রীদের তুলনায় কিছুটা বেশি। দুই পুরুষ একে অপরকে একদমই পছন্দ করতে পারে না। নিজেদের মধ্যে লড়াই নিত্য নৈমিত্যিক ঘটনা। মাঝে মধ্যে এই লড়াই এতটাই তীব্র হয়, একপক্ষের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তা চলতেই থাকে।

লড়াই বাধে মূলত খাবার বা এলাকা দখল নিয়ে। বন বা কোনও জলাশয়ের ধারের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চল আলাদা আলাদা ড্রাগনফ্লাই -এর জন্য বরাদ্দ থাকে। অবশ্য অনেক সময় নিজের চিহ্নিত এলাকায় তার পরিচিত অন্য ড্রাগনফ্লাই -কে কিছুক্ষণের জন্য তারা থাকতেও দেয়। তবে অচেনা কাউকে দেখলে যুদ্ধ অনিবার্য।

ড্রাগনফ্লাই -এর আশ্চর্য একটা ক্ষমতা রয়েছে, নিজেদের শরীরের তাপ তারা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাই পরিবেশের যে কোনও উষ্ণতায় তারা টিকে থাকতে পারে সহজে। এব্যপারে শারীরিক গঠনকে তারা বিশেষভাবে কাজে লাগায়। পরিবেশের তাপমাত্রা যখন অত্যধিক বেড়ে যায়, তাদের শরীরের উপরি অংশকে বিশেষভাবে সংকোচন ঘটিয়ে খুব দ্রুত ডানা ঝাঁপটাতে থাকে। ফলে বাইরের তাপ দেহের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। আবার পরিবেশের উষ্ণতা স্বাভাবিকের থেকে কমে গেলে, তারা শরীরের উপরি অংশকে প্রসারিত করে সূর্যের আলোয় স্থির হয়ে বসে থাকে। তারপর ডানাগুলিকে এমনভাবে সূর্যের দিকে কোণ করে রাখে, সূর্যরশ্মি ডানায় প্রতিফলিত হয়ে আরও জোরালোভাবে তাদের শরীরে এসে পড়ে। এবং শরীর ক্রমশ উষ্ণ হতে শুরু করে।

এখনও পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার প্রজাতির ড্রাগনফ্লাই -এর সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। সমস্ত প্রজাতিকে বেশ কয়েকটি শ্রেণী এবং প্রত্যেক শ্রেণীকে বেশ কয়েকটি উপশ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যেমন, অ্যাসনোইডিইয়া (অ্যাসনিডাই, অষ্ট্রোপ্যাটেলিডাই, গমফিডাই, পেটালুরিডাই), করডুলেগ্যাসট্রোইডিয়া (ক্লোরোগমফিডাই, করডুলেগ্যাসট্রিডাই, নিওপেটালিডাই), লিবেল্লুলোইডিয়া (করডুলিডাই, লিবেল্লুইডাই, ম্যাক্রোমিডাই, স্যিন্থেমিস্টেডাই) প্রভৃতি। নিজেদের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের জন্য গ্লোবাল স্কিমার, ডারনার, স্পিকেটেইলস, পিটেলটেইল, এমারেল্ড জাতের ড্রাগনফ্লাই অবাক করে দেবে যে কাউকেই।

ড্রাগনফ্লাই -এর বিশেষ কোনও অপকারিতা নেই। তবে উপকার রয়েছে ষোলআনা। কারণ শিকারের তালিকায় এদের প্রথম পছন্দ মশা। সারাদিনে একটা ড্রাগনফ্লাই একাই গড়ে ৩০-১০০টা মশা খেয়ে ফেলতে পারে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসাবে ড্রাগনফ্লাই -কে সংরক্ষণ করা যেতেই পারে।

- Advertisement -

এই সম্পর্কিত আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

সাম্প্রতিক খবর