প্রতি বছর একটি গাছে যত আমের মুকুল আসে, তার ১-৫ শতাংশ ফুল থেকে গুটি দাঁড়ায়। বাকি ফুল হয় নষ্ট হয়ে যায়, নয়তো ঝরে পড়ে মাটিতে। এই ফুলগুলি থেকে হাজার চেষ্টাতেও কোনওভাবেই ফল তৈরি করা যায় না। এটাই আমের মুকুল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এটাও আমের মুকুল এর মূল রহস্য।

শীত শেষ হয়ে সবে বসন্তে পা রেখেছে প্রকৃতি। আর তাই মুকুলে মুকুলে ছেয়ে গিয়েছে বাংলার আম বাগানগুলি। মালদা, মুর্শিদাবাদ থেকে শুরু করে নদীয়া, হুগলী বা দুই ২৪ পরগণার আম চাষিদের এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। এ বাগান, সে বাগান ঘুরে মুকুলের পরিচর্যা নিতে খুবই ব্যস্ত তারা। যে কোনও মূল্যেই হোক মুকুল বেশি ঝরতে দেওয়া চলবে না।
যদিও হাজার চেষ্টাতেও গাছের অধিকাংশ মুকুলই ঝরে যায় প্রতি বছর। কোনওভাবেই আটকানো সম্ভব নয়। লক্ষ্য করে দেখবেন, হয়তো আপনার বাড়িতে একটি বা দুটি আম গাছ রয়েছে। প্রতি বছর সমস্ত গাছ ভরে মুকুলে ছেয়ে যায়। অথচ বসন্তের শেষে দেখা যায়, যত ফুল তার তুলনায় আমের ফলন হয়েছে অনেক কম। অধিকাংশ মুকুল ঝরে পরে যায় মাটিতে। যদি সমস্ত ফুল আম হয়ে জন্মাত, হয়তো গাছের পাতার তুলনায় আমের সংখ্যায় হত বেশি। কিন্তু এমনটি হয় কি?
রহস্য এখানেই। দেখা যায়, প্রতি বছর একটি গাছে যত আমের মুকুল আসে, তার ১-৫ শতাংশ ফুল থেকে গুটি দাঁড়ায়। বাকি ফুল হয় নষ্ট হয়ে যায়, নয়তো ঝরে পড়ে মাটিতে। এই ফুলগুলি থেকে হাজার চেষ্টাতেও কোনওভাবেই ফল তৈরি করা যায় না। এটাই আমের মুকুল এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর এটাও আমের মুকুল এর মূল রহস্য। কেন এত ফুল থাকা সত্ত্বেও ফলের সংখ্যা অতি সামান্য।
আসলে এর পিছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ। যা জানলে আপনি সত্যিই অবাকই হয়ে যাবেন।
১. পুরুষ ফুল বেশি : সাধারণত আম গাছের একটি মুকুলে ৫০০ থেকে ৪০০০টি পর্যন্ত ফুল থাকতে পারে। এই ফুলগুলি হয়ে থাকে দুই ধরণের, পুরুষ ও স্ত্রী বা উভলিঙ্গ। মজার বিষয়, এখানে পুরুষ ফুলের সংখ্যায় হয়ে থাকে সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ একটি গাছে প্রতি বছর যত মুকুল আসে, তাতে প্রায় ৬০-৯০ (প্রজাতি ভেদে) শতাংশই থাকে পুরুষ ফুল।
অতি পুরুষ ফুল হওয়ার পিছনেও রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কারণ। এক্ষেত্রে গাছ সবসময়ই চায়বে শক্তি সাশ্রয় করতে। এছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে গাছ চায়বে অধিক পরাগায়নের জন্য বেশি পরিমাণে পরাগ উৎপাদন করতে। অধিক পুরুষ ফুল ছাড়া যা কোনওভাবেই সম্ভব নয়।
২. কম স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল : পুরুষ ফুল বাদে বাকি ফুলগুলি অবশ্যই স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল হয়ে থাকে। শতাংশের দিক থেকে এর পরিমাণ কম মনে হলেও ফলনের দিক থেকে তেমন কম নয়, যদি না সমস্ত স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল থেকে আম বেরিয়ে আসত। কিন্তু মজার বিষয়, সমস্ত স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল থেকেও কিন্তু ফল বের হয় না। এরও প্রায় অর্ধেক ফুল ঝরে যায়। কারণ সব ফুল বিভিন্ন কারণে পরাগায়ন হতে পারে না।
৩. নির্দিষ্ট তাপমাত্রা : আম গাছে মুকুল আসার সেরা সময় শীতের শেষ বা বসন্তের শুরু (জানুয়ারি থেকে মার্চ)। কারণ এই সময় রাতের তাপমাত্রা থাকে ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। আর সেই সঙ্গে থাকে কম আর্দ্রতা ও শুষ্ক আবহাওয়া। এই পরিবেশের তারতম্য গাছে মুকুল কম ফোটে বা মুকুল ফুটলেও তা ঝরে যেতে পারে। সাধারণত বেশি তাপমাত্রায় গাছ নিজেই মুকুল ঝরিয়ে দেয়।
৪. গাছ নিজেই মুকুল ঝরিয়ে দেয় : শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, গাছ কিন্তু নিজেও মুকুল ঝরিয়ে দিয়ে থাকে। গাছ যখন বুঝতে পারে, ফলন তার ধারণ ক্ষমতার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন সে নিজের সামর্থ্য বুঝে অতিরিক্ত মুকুল ঝরিয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় Natual Fruit Drop।
৫. পরাগায়ন : আমের মুকুল এর পরাগায়ন একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বিষয়। এই পরাগায়নের জন্য প্রয়োজন হয় বাহ্যিক কোনও প্রভাব। আর এই কাজটি করতে পারে এক মাত্র মৌমাছি, মাছি বা পিঁপড়ের মতো পতঙ্গেরা। বর্তমানে কীটনাশকের প্রভাবে উপকারি পতঙ্গের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। তাই স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল ঝরে গিয়ে আমের ফলনও কমে যাচ্ছে যথেষ্ট হারে।
সব শেষে এটা বলে রাখা প্রয়োজন, আমের মুকুল এ পুরুষ ফুলের পরিমাণ অধিক হওয়ায় আমের মুকুল ঝরে যাওয়ার পরিমাণও বেশি। এতে মন খারাপের কিছু নেই। এই ফুল তো ঝরারই ছিল। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে স্ত্রী বা উভলিঙ্গ ফুল যেন অতি পরিমাণে না ঝরতে পারে। তার জন্য চায় বিশেষ পরিচর্যা। ঠিকঠাক পরিচর্যা আর উপকারি পতঙ্গদের দ্বারা অধিক পরাগায়ন আমের ফল বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে।


